"বিসর্জন"
সুজিত অধিকারী
প্রতিদিন আসে নতুন সকাল ,প্রতিদিন আসে ভোর।
কিন্তু আজকের সকাল বিষাদে ভরা ' দুখের নাই ওর '।
এই রকম সকাল বছরে একবারই আসে ।
উঠানের শিউলি ফুল গুলো মুখ ঘুরিয়ে
করুণ চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সর্বজয়ার দিকে।
সর্বজয়া কাল রাত্রিতেই চলে গেছেন সপরিবারে ।
তাঁর এই যাওয়া টা কেউ মেনে নিতে পারে না । কিন্তু
তিনি তো যাবেনই , তিনি যে মহামায়া ,
সকলকে মায়ায় বেঁধে আপনি মায়া মুক্ত ।
কোন বাধা
মানেন না।
চৌধুরী বাড়ীর বড় ছেলে
"বিলেত ফেরত"।
বিজয়ার শোকে রাতের অবশিষ্ট "শ্যাম্পেন "টা
খালি পেটেই সাবাড় এক নিমেষে ।
এদিকে ...গঙ্গার ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা ।
তার মধ্যে একটা নৌকায় স্বজন হারিয়ে
বসে আছে
পরাণ মাঝি । কাল রাত্রিতে তার
বছর আশির বৃদ্ধা " মা "
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে,চলে গেল না ফেরার দেশে ।
দাহ করার মত টাকা পয়সা কিছুই নেই ,
তাই মাঝ গঙ্গায় মায়ের দিলো বিসর্জন ।
দুর্গা প্যান্ডেলের বাঁশ গুলো তখনও খোলা হয় নি
ভোরের ট্রেন একটু পরেই ছেড়ে বেরিয়ে যাবে,
গঙ্গার ঘাটে স্টিমারের আওয়াজ ,একদল ভবঘুরে
খাবারের খোঁজে এ ঘাট সে ঘাট ঘুরে বেড়াচ্ছে।
শ্মশান যাত্রীর হরিধ্বনি ।একদল মুদ্দোফরাশ হাই
তুলতে তুলতে বেসুরো গান গাইছে , এই পুজোতে
ওদের ছুটি নেই ।
মৃত্যুতে যে থেমে থাকে না ........!!!
পরাণের ছোট ছেলে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ওর
বাবার জন্য খুঁজে ফেরে সাদা থান ।
পরাণের বউ তিন দিন উপোস ।
দানা পানি পেটে যায় নি, যা ছিলো
ঘটি বাটি সব নিয়ে গেছে "ডেঙ্গু " তে ........!
"পরাণের " ঢুলু ঢুলু লাল চোখ , কানে
বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজ--
"ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন"।
তবু মর্মে প্রবেশ করে তার মায়ের কন্ঠস্বর,.......
"ওরে পরাণ , বাড়ী যা বাবা ,তোর বাবা বাড়ীতে একলা আছে ।"
নিশ্চুপ পরাণ চোখের জলে দেখতে পায় তার
মায়ের নিথর দেহ মাঝ গঙ্গায় আস্তে আস্তে
হাসি মুখে তলিয়ে যাচ্ছে ,মা দুর্গার সাথে ।

Social Plugin