মহাভারতের নারী
============
আমি মহাভারতের নারী
আমি ভারতবর্ষের নারী।
আমি পৃথা আমি দ্রৌপদী আমি অম্বা অম্বালিকা
আমিই গান্ধারী ।
পেরিয়ে এলাম কত যুগ
পেরিয়ে এলাম কত পথ ও প্রান্তর
পেরিয়ে এলাম সভ্যতার কত অভিঘাত।
যমুনাতে খেয়া নৌকা করেছি পারাপার
গঙ্গার জলে ভাসিয়েছি প্রদীপ
রন্ধনে দ্রৌপদী হয়ে করেছি পুরুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি
নিরলস সংসার প্রেমে।
আমি মহাভারতের নারী
আজও আমি দ্রৌপদী হয়ে লাঞ্ছিত হই
আজও আয়োজিত হয় বস্ত্রহরণ
আজও মাথা নীচু করে বসে থাকে
পরান্নভোজী পিতামহ পিতামহী ,
বিকৃত উল্লাসে ফেটে পড়ে শত ভ্রাতা তাঁবেদার যত
কারও শিরদাঁড়া বক্র কারও সুবিধাবাদী ।
কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে যায় চোখের জল
যন্ত্রণায় রক্তাক্ত হতে হতে ফুরিয়ে যায়
অসম্মানের জীবন।
আজও আমাকে উৎপাদন করতে হয় পুত্র
কুন্তী হয়ে অম্বিকা হয়ে অম্বালিকা হয়ে ।
আজও শাল্বরাজের কাছে
নির্দোষ প্রেমময়ী অম্বা হয় প্রত্যাখ্যাতা
আজও নিষ্পাপ দেবযানী হয়
প্রতারক কচের দ্বারা প্রতারিতা।
আজও বীতকাম ঋষির ও দেবতার
কামনা ও ছলনায়
কলঙ্কিত হয় আমার কৌমার্য ।
আজও গান্ধারী ভানুমতীকে হরণ করা হয় বলপূর্বক
আজও মনে করা হয়
নারীদের মন বলে কিছু থাকতে পারে না
আজও পুরুষের এটাই দাবী যে
নারী পুরুষের শাসন মানতে বাধ্য
পুরুষের ইচ্ছাই নারীর ইচ্ছা
পুরুষ সম্রাট আর নারী ক্রীতদাসী।
অথচ আজও আমি ছায়া হতে জানি
আজও আমি মায়া হতে জানি
আজও আমি আকাশে জ্বেলে দিই সন্ধ্যাতারা
আজও আমি অভিমন্যুর স্বপ্নে ছড়ায় আবীর
আজও আমি পরিশ্রান্ত সন্তানের কপালে
আদরের চুম্বন।
আমি সুভদ্রা, আমি আজও অর্জুনের জন্য অবলম্বন।
আমি উর্বশী
আজও আমি বৃহন্নলার জন্য অভিশাপের ছলে আশীর্বাদ।
আমি কৃষ্ণা
অর্জুন আজও আমার প্রতীক্ষাতেই থাকে।
আমি মহাভারতের নারী
আমি ভানুমতী হয়ে সহ্য করি
দুর্যোধনের অনাচার, মুখ বুজে ।
আমি অম্বিকা , চোখ বন্ধ করে স্পৃষ্ট হই
বীভৎসদর্শন বিকটগন্ধ ব্যাসদেবের দ্বারা।
আমি মাধবী হয়ে চরম অপমান বক্ষে ধরে
হাতবদল হতে বাধ্য হই।
আমি অসংখ্য যোদ্ধার স্ত্রী হয়ে
স্বামী পুত্র স্বজনের ধুলোলাঞ্ছিত
শির কবন্ধ কঙ্কাল মৃতদেহ জড়িয়ে
হাহাকার করি কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গনে।
তবু আমি মহাভারতের নারী
প্রতিবাদে ঝলসে উঠতেও জানি।
আমি জেগে উঠি যজ্ঞের আগুনের ভিতর থেকে
আমি উঠে আসি অতলান্ত নদীগহ্বর থেকে
আমি প্রতিবাদিনী গান্ধারী হয়ে মরুদেশ থেকে
এসে দাঁড়াই হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে
দুটি চক্ষু আবরণে ঢেকে,
আমি দেবযানী হয়ে
বিশ্বাসভঙ্গকারী কচকে করি অভিশাপবিদ্ধ,
আমি আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে
শিখণ্ডী হয়ে জন্মায় ভীষ্ম বধের অভিপ্রায়ে।
আজও আমার বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ
শোনা যায় ভারতের বুকে কান পাতলেই
আজও আমার চিৎকার থামেনি
লড়াই থামেনি মুক্তির বাসনায়,
আমার প্রতিশোধ বাসনা আজও জ্বলন্ত।
তবু আজও প্রণয়েই আস্থা রাখি
বিশ্বাস রাখি ভালবাসায় সাহচার্যে সহমর্মিতায়।
তবুও তো ভীমসেন থাকে
নিঃস্বার্থ ভালবাসার অভিজ্ঞান হয়ে,
তবুও তো কর্ণ থাকে
বিরহের দহনে ক্লান্ত হতে হতে
প্রণয়ের কণ্ঠে পরিয়ে দিতে বিজয়মাল্য ,
তবুও তো বিকর্ণ থাকে
দ্রৌপদীর অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়ে ।
তবুও তো কৃষ্ণ থাকে
উদ্ধার করে ষোলো হাজার বন্দিনীকে
অত্যাচারী নরকাসুরের হাত থেকে
তাদের ভূষিত করে অধিষ্ঠিত করে সম্মানের আসনে।
তবুও তো কৃষ্ণ থাকে দ্রৌপদীর সখা হয়ে
বিপদের দিনে তার পাশে দাঁড়ায় ।
তবুও তো কৃষ্ণ থাকে
মাথা পেতে নেয় সর্বহারা শোকবিদ্ধা গান্ধারীর অভিশাপ।
===== অনুপম সৌরিশ সরকার


Social Plugin